নেত্রকোনার মদনে ১১ বছরের এক শিশু শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের ফলে জন্ম নেওয়া নবজাতকের আসল বাবা কে—সেই প্রশ্নের অবসান ঘটেছে। আদালতের নির্দেশে সিআইডি (CID)-এর করা ডিএনএ (DNA) পরীক্ষার প্রতিবেদনে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, মামলার একমাত্র অভিযুক্ত মাদরাসা শিক্ষক আমান উল্লাহ মাহমুদী সাগরই সেই নবজাতকের জৈবিক পিতা।
গতকাল সোমবার (২৪ আগস্ট) নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে এই ডিএনএ পরীক্ষার রিপোর্ট আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করা হয়।
ডিএনএ রিপোর্ট ও আদালতের বক্তব্য
আদালতে রিপোর্ট পেশ করার পর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট নুরুল কবীর রুবেল।
তিনি পিস নিউজ কে জানান, “সিআইডির হস্তান্তরিত ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদনে স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে যে অভিযুক্ত শিক্ষক আমান উল্লাহ মাহমুদী সাগরই শিশুটির গর্ভে জন্ম নেওয়া নবজাতকের জৈবিক বাবা। সোমবারই আসামিকে রিমান্ড ও চিকিৎসা শেষে কড়া নিরাপত্তায় আদালতে হাজির করা হয়। আমরা আশাবাদী, আগামী ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে এই চাঞ্চল্যকর ও স্পর্শকাতর মামলার বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।”
পাপের সূচনা যেভাবে: অসহায়ত্বের সুযোগ
মামলার নথিপত্র ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্ত শিক্ষক আমান উল্লাহ মাহমুদী সাগর প্রায় চার বছর আগে নেত্রকোনার মদনে একটি মহিলা কওমি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। ভুক্তভোগী শিশুটির বাবা-মায়ের মধ্যে পারিবারিক বিচ্ছেদ ঘটার পর সে তার নানা-নানির আশ্রয়ে থেকে ওই মাদরাসায় পড়াশোনা শুরু করে। অন্যদিকে, শিশুটির মা পরিবারের জীবিকার তাগিদে সিলেটে বাসাবাড়িতে গৃহপরিচারিকার কাজ করতেন। বাড়িতে অভিভাবকত্ব ও সুরক্ষার অভাবের সুযোগ নিয়েই মাদরাসা শিক্ষক সাগর শিশুটিকে বিভিন্ন সময়ে ভয়ভীতি ও প্রলোভন দেখিয়ে একাধিকবার ধর্ষণ করেন বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়।
যেভাবে ঘটনা প্রকাশ্যে আসে
দীর্ঘদিন বিষয়টি চেপে রাখা হলেও গত এপ্রিল মাসে শিশুটি তীব্র শারীরিক অসুস্থতা বোধ করতে শুরু করে। পরবর্তীতে ১৮ এপ্রিল তার শারীরিক গঠনে বড় ধরনের পরিবর্তন চোখে পড়লে স্বজনরা তাকে মদন পৌর শহরের একটি বেসরকারী ক্লিনিকে নিয়ে যান। সেখানে আল্ট্রাসনোগ্রামসহ প্রয়োজনীয় শারীরিক পরীক্ষা শেষে চিকিৎসকরা জানান, ১১ বছর বয়সী এই শিশুটি অন্তঃসত্ত্বা।
এই খবরে এলাকা জুড়ে চরম চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। পরে শিশুটির মা সিলেট থেকে ফিরে এসে ঘটনার বিস্তারিত শোনেন এবং ২৩ এপ্রিল বাদী হয়ে মদন থানায় মাদরাসা শিক্ষক আমান উল্লাহ মাহমুদী সাগরকে একক আসামি করে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা দায়ের করেন।
গ্রেপ্তার, রিমান্ড ও সেফ হোম
মামলা দায়েরের পরপরই আসামিকে ধরতে অভিযান শুরু করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। গত ৬ মে ময়মনসিংহের গৌরীপুর এলাকা থেকে অভিযুক্ত শিক্ষককে গ্রেপ্তার করে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)। পরদিন ৭ মে পুলিশ আসামিকে আদালতে পাঠালে বিচারক তার তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
এদিকে ভুক্তভোগী শিশুটির নিরাপত্তা ও তার ভবিষ্যৎ চিকিৎসার কথা বিবেচনা করে আদালতের নির্দেশে গত ১২ মে তাকে সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীনে সিলেটে অবস্থিত একটি সেফ হোমে স্থানান্তর করা হয়।
সন্তান জন্মদান ও ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ
সিলেটের সেফ হোমে চিকিৎসকদের নিবিড় তত্ত্বাবধানে থাকা অবস্থায় গত ২ জুলাই ভুক্তভোগী শিশুটি একটি সুস্থ কন্যাসন্তানের জন্ম দেয়। সন্তান জন্মদানের পর অপরাধ প্রমাণের স্বার্থে নবজাতক ও অভিযুক্ত শিক্ষকের ডিএনএ পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নেয় পুলিশ।
গত ৯ জুলাই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে নবজাতক ও শিক্ষকের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের আবেদন জানান। আদালত আবেদন মঞ্জুর করলে ২৮ জুলাই সিআইডির একটি বিশেষজ্ঞ দল সিলেট সেফ হোমে গিয়ে শিশু ও তার নবজাতকের নমুনা সংগ্রহ করে ল্যাবে পাঠায়। চূড়ান্ত ফলাফলেই উন্মোচিত হলো আসামির আসল অপরাধ।
বর্তমানে অভিযুক্ত শিক্ষক জেলা কারাগারে আটক রয়েছেন। ডিএনএ রিপোর্ট হাতে পাওয়ায় তদন্তকারী সংস্থা দ্রুততম সময়ে আদালতে চূড়ান্ত চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করবে বলে জানা গেছে।
[ Peace News বাংলা ]

