দিল্লিতে শিক্ষার্থী বিক্ষোভে পুলিশি দমন-পীড়ন নিয়ে বিরোধীদের তোপের মুখে থাকা বিজেপি এবার ঝাড়খণ্ডের রাঁচিতে শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি লাঠিচার্জের ঘটনাকে পাল্টা রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। সোমবার রাঁচিতে সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় দুর্নীতি, প্রশ্নপত্র ফাঁস ও অনিয়মের অভিযোগে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের বিধানসভা অভিযানে জলকামান ও লাঠিচার্জের ঘটনায় মঙ্গলবার সংসদ চত্বরে সরব হন বিজেপি ও এনডিএর সাংসদরা। তাঁদের দাবি, ঝাড়খণ্ডের ঘটনার জন্য কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীকে ক্ষমা চাইতে হবে।
এদিকে দিল্লিতে শিক্ষার্থী বিক্ষোভে পুলিশি বলপ্রয়োগের প্রতিবাদে বিরোধীদের দাবিতে টানা তিন সপ্তাহ ধরে সংসদের কার্যক্রম কার্যত অচল। বিরোধীরা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ক্ষমাপ্রার্থনা এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর জবাবদিহি দাবি করে আসছেন। তাঁদের অভিযোগ, দিল্লির বিক্ষোভ দমনে পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীকে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তবে তিন সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও প্রধানমন্ত্রী বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ বিষয়ে বিরোধীদের দাবি মেনে কোনো স্পষ্ট জবাব দেননি।
ঙ্গলবার সংসদ ভবন চত্বরে সরকার ও বিরোধী পক্ষের পাল্টাপাল্টি বিক্ষোভ ও স্লোগানে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এর প্রভাব পড়ে সংসদের উভয় কক্ষের কার্যক্রমেও। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এদিনও লোকসভা বা রাজ্যসভায় উপস্থিত হননি। আগামী বৃহস্পতিবার বর্ষাকালীন অধিবেশনের শেষ দিন হওয়ায় অচলাবস্থা কাটানো নিয়ে রাজনৈতিক মহলে চাপ বাড়ছে।

রাঁচিতে কী ঘটেছিল?
সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় দুর্নীতি, প্রশ্নপত্র ফাঁস ও অনিয়মের অভিযোগ তুলে বেশ কিছুদিন ধরেই আন্দোলন করছেন ঝাড়খণ্ডের শিক্ষার্থীরা। নিয়োগ পরীক্ষা বাতিল, দায়ীদের শাস্তি এবং দুর্নীতির তদন্তভার সিবিআইয়ের হাতে তুলে দেওয়ার দাবিতে সোমবার তাঁরা বিধানসভা ভবন অভিযানের কর্মসূচি নেন।
বিক্ষোভকারীদের ঠেকাতে পুলিশ জলকামান ব্যবহার করে এবং লাঠিচার্জ করে। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের মধ্যে কয়েকজন আহত হন বলে অভিযোগ। দীর্ঘদিন ধরে অনশনে থাকা ছাত্রনেতা দেবেন্দ্র মাহাতোও ওই কর্মসূচিতে অংশ নেন। পরে অসুস্থ হয়ে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তিনি প্রায় ১০ দিন ধরে অনশন করছেন।
এই ঘটনাকেই মঙ্গলবার সংসদ চত্বরে বিজেপি-এনডিএর সদস্যরা রাজনৈতিকভাবে তুলে ধরেন। তাঁদের অভিযোগ, কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ঝাড়খণ্ড সরকার শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি দমন চালিয়েছে। তাই রাহুল গান্ধীকে এ ঘটনার জন্য ক্ষমা চাইতে হবে।
রাহুলের অবস্থান কী?
তবে রাহুল গান্ধী ঝাড়খণ্ডের ঘটনার নিন্দা করে ইতিমধ্যেই প্রকাশ্যে নিজের অবস্থান জানিয়েছেন। সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি বলেন, আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি বলপ্রয়োগ ভুল সিদ্ধান্ত। শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের অধিকার শিক্ষার্থীদের রয়েছে এবং আলোচনার মাধ্যমেই সমস্যার সমাধান করা উচিত।
ঝাড়খণ্ড সরকারকেও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনায় বসে দ্রুত সমস্যার সমাধানের আহ্বান জানান তিনি।একইভাবে ইনস্টাগ্রামের ‘আস্ক মি এনিথিং’ অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থী আন্দোলন প্রসঙ্গে রাহুল বলেন, দেশের শিক্ষার্থীরা বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার নানা সমস্যার বিরুদ্ধে আন্দোলন করছেন। তাঁর মতে, কেন্দ্রীয় সরকার হোক বা কোনো রাজ্য সরকার—শিক্ষার্থীদের দাবি বিবেচনা করে শিক্ষাব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় সংস্কার আনা উচিত।
সংসদ চত্বরে বিজেপি সাংসদরা রাহুলকে আক্রমণের লক্ষ্য বানালে কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভদ্রাও পাল্টা জবাব দেন। তাঁর বক্তব্য, রাহুল ইতিমধ্যেই ঝাড়খণ্ডে পুলিশি অত্যাচারের নিন্দা করেছেন এবং আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পাশে থাকার কথা বলেছেন।

দুই দাবিতে অচলাবস্থা
ঝাড়খণ্ড সরকার জানিয়েছে, আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের প্রায় ৯৮ শতাংশ দাবি ইতিমধ্যেই মেনে নেওয়া হয়েছে। তবে দুটি গুরুত্বপূর্ণ দাবিতে এখনও সমঝোতা হয়নি। এর একটি হলো নিয়োগ পরীক্ষায় দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত সিবিআইয়ের হাতে তুলে দেওয়া এবং অন্যটি হলো ঝাড়খণ্ড স্টাফ সিলেকশন কমিশন (জেএসএসসি) ও কম্বাইন্ড গ্র্যাজুয়েট লেভেল (সিজিএল) পরীক্ষা বাতিল করা।
এই দুই দাবি নিয়েই রাজ্য সরকার ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে মূল টানাপোড়েন চলছে।
অন্যদিকে ঝাড়খণ্ডে বিরোধী দল বিজেপি শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সমর্থনে এবং পুলিশের লাঠিচার্জের প্রতিবাদে ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে।
দিল্লি বনাম ঝাড়খণ্ড—রাজনীতির নতুন সংঘাত
দিল্লির শিক্ষার্থী বিক্ষোভে পুলিশি বলপ্রয়োগ নিয়ে যখন বিজেপি সরকার বিরোধীদের তীব্র আক্রমণের মুখে, ঠিক তখনই ঝাড়খণ্ডের একই ধরনের ঘটনায় বিজেপির পাল্টা অবস্থান রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দিল্লিতে বিরোধীরা যেমন প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জবাবদিহি চাইছেন, তেমনি ঝাড়খণ্ডের ঘটনায় বিজেপি রাহুল গান্ধীর ক্ষমাপ্রার্থনা দাবি করছে।
ফলে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ও পুলিশি দমন-পীড়নের প্রশ্নটি এখন শুধু রাজ্য বা প্রশাসনিক ইস্যুতে সীমাবদ্ধ নেই; তা পরিণত হয়েছে কেন্দ্র ও বিরোধীদের বড় রাজনৈতিক সংঘাতে। সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশনের শেষ প্রান্তে এসে দিল্লি ও ঝাড়খণ্ডের দুটি ঘটনা সেই সংঘাতকে আরও তীব্র করে তুলেছে।
[ Peace News বাংলা ]

