ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর শাসনকাল বিশ্ব ইতিহাসে কেবল সামরিক বিজয়ের জন্যই নয়, বরং একটি সুসংহত, ন্যায়ভিত্তিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলার জন্য স্মরণীয়। পারস্য ও রোমান সাম্রাজ্য জয়ের পর বিশাল রাজস্ব ও নতুন নাগরিকদের অর্থনৈতিক সুশাসন নিশ্চিত করতে তিনি প্রথাগত সাময়িক রাজস্ব ব্যবস্থার বদলে একটি স্থায়ী আমলাতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থা চালু করেন।
খলিফা উমর (রা.)-এর প্রবর্তিত প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারের মূল বিষয়গুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

- বাইতুল মালের প্রাতিষ্ঠানিক আধুনিকায়ন: মদিনায় সুবৃহৎ কেন্দ্রীয় কোষাগার বা ‘বাইতুল মাল’ প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি বিজিত অঞ্চলগুলোতে এর শাখা বিস্তৃত করেন। কর সংগ্রাহক হিসেবে ‘সাহেবুল খারাজ’ ও কোষাধ্যক্ষ হিসেবে ‘সাহিবে বাইতুল মাল’ পদ সৃষ্টি করা হয়। বিশিষ্ট সাহাবি হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আরকাম (রা.)-কে প্রধান কোষাধ্যক্ষ নিয়োগ দেওয়া হয়।
- দেওয়ান ব্যবস্থা ও আদমশুমারি: রাজস্ব বণ্টন ও বাজেট ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনতে খেলাফতে প্রথম নিয়মতান্ত্রিক আদমশুমারি ও রেজিস্ট্রি বিভাগ (‘দেওয়ান’) গঠন করেন। নাগরিকদের ত্যাগ ও আর্থিক অবস্থা বিবেচনা করে ভাতা নির্ধারণ করা হয়, যেখানে বদরি সাহাবিদের জন্য বার্ষিক ৫ হাজার দিরহাম থেকে শুরু করে সবার জন্য ন্যায্য ভাতার ব্যবস্থা করা হয়।
- নিয়মিত সামরিক বাহিনী ও সৈনিকদের কল্যাণ: ইতিহাসে প্রথম নিয়মিত বেতনভুক্ত ও সুশৃঙ্খল সামরিক বাহিনী গঠন করে তাদের বাসস্থান, পোশাক ও স্থায়ী বেতনের ব্যবস্থা করা হয়। সৈনিকদের দীর্ঘসময় সীমান্ত এলাকায় না রেখে সর্বোচ্চ চার মাস পর পর পরিবারের কাছে ফেরার ঐতিহাসিক নির্দেশ জারি করা হয় এবং সে সময় সৈন্যদের পরিবারের সমস্ত ব্যয় বাইতুল মাল থেকে বহন করার আইন পাস হয়।
- নবজাতকের জন্য নাগরিক ভাতা: জন্মসূত্রে প্রতিটি শিশুর নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করে তিনি যেকোনো নবজাতক ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর থেকেই বাইতুল মাল থেকে স্থায়ী ভাতার ঘোষণা দেন।
- কঠোর প্রশাসনিক জবাবদিহি ও দুর্নীতি প্রতিরোধ: সরকারি কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত ব্যবসা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয় এবং দায়িত্বে যোগদানের পূর্বে ও পরে তাদের সম্পদের নিখুঁত হিসাব নেওয়া হতো। এমনকি মিসরের গভর্নর আমর ইবনুল আস (রা.) এবং নিজের সন্তান আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.)-এর অতিরিক্ত উপার্জন ও সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে তিনি স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর নজির স্থাপন করেন।
শাসকের ভোগবিলাস নয়, বরং কঠোর জবাবদিহি, সাধারণ জীবনযাপন ও অর্থনৈতিক মিতব্যয়িতার মাধ্যমে খলিফা উমর (রা.) বিশ্বকে একটি প্রকৃত জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রের মডেল উপহার দিয়েছিলেন।
[ Peace News বাংলা ]

